আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে মার্কিন প্রশাসনের সক্রিয় ইন্ধন ছিল—এই কথাটি এখন আর গুজব নয়, বরং নানামুখী প্রমাণ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে ক্রমেই প্রতিষ্ঠিত সত্যে রূপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির আড়ালে যে গোপন রাজনীতি চলে, তা হয়তো জনসাধারণের দৃষ্টিগোচর হয় না, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন কথোপকথন, অর্থনৈতিক লেনদেন ও কূটনৈতিক তৎপরতার তথ্য ফাঁস হতে থাকে—তখন আসল চিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনিস আলমগীর এবার সেই চক্রান্তকে সবার সামনে আনলেন।
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিরব সমর্থনের অভিযোগ উঠেছে বহুবার। বিশেষত, যখন দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এমন কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ রেখেছে, যারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। এসব আন্দোলনকারী নিজেরাই স্বীকার করেছেন, তারা একাধিক বৈঠকে মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন এবং তারা আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থায়ন পেয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যখন বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্ত করছিল, অন্যদিকে ওয়াশিংটন চেয়েছিল তাদের প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রাখতে। বিশেষত, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের বারবার সরকারবিরোধী নেতাদের সঙ্গে দেখা করা, বিভিন্ন এনজিও ও তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনের মাধ্যমে একপেশে প্রতিবেদন প্রকাশ, এবং স্যাংশনের হুমকি—এসবই ছিল একটি বৃহৎ কৌশলের অংশ। এই কৌশলের লক্ষ্য ছিল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে একটি ‘পছন্দসই সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা।
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাও স্বীকার করেছেন যে তাদের সঙ্গে বিদেশি দূতাবাসগুলোর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং এই সম্পর্ক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহায়তায় পরিণত হয়েছিল। এই বিষয়গুলো আজ আর অজানা নয়, বরং মিডিয়াতে এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তাই বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের নেপথ্যে বিদেশি প্রভাব, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল তা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। সময়ই হয়তো একদিন আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দেবে, কীভাবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি পরাশক্তি ‘গোপন খেলোয়াড়’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

