ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৭ মে ২০২৬
  1. অন্তবর্তী সরকার
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি ডেস্ক
  4. অস্ত্র
  5. আত্মহত্যা
  6. আন্তর্জাতিক
  7. আহত
  8. ইতিহাস
  9. ইলিশ মাছ
  10. উচ্চ বাজার দর
  11. উপহার
  12. এনসিপি
  13. কাজী নজরুল ইসলাম
  14. কারামুক্তি
  15. কুমিল্লা

আরেকটি প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আমরা

আরাফাত খলিল
মে ৭, ২০২৬ ৮:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

​ইতিহাস কখনো সরলরেখায় চলে না, বরং অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়েই তৈরি করে নেয় নিজের আপন পথ। ২০০৭ সালের ৭ মে ছিল তেমনই এক অগ্নিস্নানের দিন। সেদিন তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রক্তচক্ষু আর নিশ্চিত মৃত্যুভয় তুচ্ছজ্ঞান করে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা। নিষেধাজ্ঞার শিকল ভেঙে তাঁর সেই প্রত্যাবর্তন ছিল মূলত অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের মুক্তির সোপান।

​২০২৪ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেছিলেন, “সেই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেক উপদেষ্টাও ফোন করে বলেছিলেন আপনি আসবেন না। আপনার বাইরে থাকার যা যা লাগে আমরা করব। আবার কেউ কেউ আমাকে ধমকও দিয়েছিল। এ কথা বলা হয়েছিল বাংলাদেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই মেরে ফেলা হবে। আমি বলেছিলাম আলহামদুলিল্লাহ বাংলাদেশের মাটিতেই মরব। কিন্তু আমি আসব। সকল এয়ারলাইনসকে নিষেধ করা হয়েছিল আমাকে যাতে বোর্ডিং পাস দেওয়া না হয়। আমেরিকার বিমানবন্দরে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে ঝগড়া করে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে করে লন্ডনে আসি। সেখানে আসার পরে যখন প্লেনে উঠতে যাব, তখন আমাকে উঠতে দেওয়া হয়নি। সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যেভাবে হোক বাংলাদেশে আসব। এমনকি যখন আমি বিমানবন্দরে রওনা হই তখন অনেকেই ফোন করে বলেছিল আপনি আসবেন না, আসলে মেরে ফেলে দেবে। আমি পরোয়া করিনি।”

​বঙ্গবন্ধুকন্যার এই অটল সংকল্প প্রমাণ করে, হিমালয়সম সাহস যাঁর রক্তে, তাঁকে কোনো হুমকিতেই কখনো থামিয়ে রাখা যায়নি। আগামীতেও থামিয়ে রাখা যাবে না।

​২০০৭ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজের চোখের চিকিৎসা ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তাঁর পুত্রবধূর অসুস্থতার খবরে সেখানে যান। এরপরই শুরু হয় তাঁকে দেশে ফিরতে না দেওয়ার কূটকৌশল। শুধু হুমকি-ধমকি নয়, দেওয়া হয় একের পর এক মিথ্যা মামলা; জারি করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও। এমনকি ২০০৭ সালের ১৮ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রেসনোটে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের কান্ডারি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি’ ঘোষণা করে তাঁর দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

​তৎকালীন সরকার কর্তৃক তাঁর দেশে ফেরা বাধাগ্রস্ত করার বহুমুখী তৎপরতায়ও ন্যূনতম বিচলিত না হয়ে বরং দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার নজির দৃশ্যমান করেছিলেন।

​তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে জনগণ যখন উৎকণ্ঠিত, সেই সময়েই ১১ এপ্রিল ওয়াশিংটনে এক সভায় জাতির পিতার দুঃসাহসী কন্যা দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে জীবন দেব কিন্তু কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না।’ ওই দিনই বার্তা সংস্থা এপির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জননেত্রী বলেছিলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা হত্যা ও চাঁদাবাজির মামলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। আইনি পথেই মামলার মোকাবিলা করা হবে। হেয় করতেই এ মামলা দেওয়া হয়েছে। আমি নির্ধারিত তারিখের আগেই আমার দেশে ফিরে যাব। ইতিমধ্যে বিমানের টিকিটও কাটা হয়ে গেছে।’

​ওয়াশিংটন থেকে ১৯ এপ্রিল তিনি লন্ডন পৌঁছান এবং দেশে ফেরার সম্ভাব্য তারিখ ২৩ এপ্রিল নির্ধারণ করে ঘোষণাও দেন। তৎকালীন ফখরুদ্দীন সরকারের কুটিল কূটনীতিতে সকল বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ২২ এপ্রিল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ শেখ হাসিনাকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেয়নি। তৎকালীন অনির্বাচিত সরকারের দমননীতির মুখে শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার ব্যাকুলতা শুধু এ দেশের মানুষকে নয়, বিশ্ববাসীকেও স্পর্শ করে। ২৩ এপ্রিল বিশ্বের ৪১টি দেশের ১৫১টি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় শেখ হাসিনার দেশে ফিরতে না পারার বিষয়ে খবর ছাপা হয়। সাহস, দেশপ্রেম এবং মাতৃভূমিতে ফিরে আসার অদম্য আকাঙ্ক্ষার কারণে তখন শেখ হাসিনা রাতারাতি বিশ্ব রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হন।

​৭ মে ২০০৭। ঢাকা বিমানবন্দর এলাকা সেদিন রূপান্তরিত হয়েছিল এক জনসমুদ্রে। জরুরি অবস্থার কড়াকড়ি আর ঘরোয়া রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মানুষের আবেগের কাছে পরাজিত হয়েছিল সব বাধা। হাজার হাজার মানুষ প্রিয় নেত্রীকে স্বাগত জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। বিমানবন্দর থেকে রাসেল স্কয়ার- সাধারণ মানুষের ভিড়ে এই সামান্য পথ পাড়ি দিতে সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যার তিন ঘণ্টা সময় লেগেছিল।

​শেখ হাসিনার এই সাহসী ও বিচক্ষণ দৃঢ়তায় দেশে ফেরার গুরুত্ব বুঝতে ১২ মে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো একটি গোপন তারবার্তা বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, “শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগে গুঞ্জন ছিল, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হুমকির মুখে বিদেশে নির্বাসনে গেছেন। ফেরার পর এ গুঞ্জনের অবসান হয়। একই সঙ্গে তাঁর দেশে ফেরার ঘটনায় তাঁকে দল থেকে পদচ্যুত করা বা বিভিন্ন নেতার দল ছেড়ে যাওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল, তা ভেস্তে যায়।” গোপন তারবার্তায় এও বলা হয়, “দেশে ফেরার দিন আওয়ামী লীগের নেতারা শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে যান। সেখানে এমন তিনজন নেতাও ছিলেন, যারা চার সপ্তাহ আগেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।”

​১৯৮১ সালের ১৭ মে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বিকেলে যখন তিনি প্রথম দেশে ফেরেন, সেদিনও পঁচাত্তরে স্বজন হারানো এক নিঃস্ব নারী হিসেবে নয়, বরং শোককে শক্তিতে রূপান্তর করা এক আলোকবর্তিকা হয়েই ফিরেছিলেন। এরপর ২০০৭-এর ৭ মে ছিল তাঁর দ্বিতীয় ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন।

​নিষেধাজ্ঞার শিকলে কি আর সাহসকে বেঁধে রাখা যায়? শেখ হাসিনা তাঁর ‘ওরা টোকাই কেন’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা: ৫৩) লিখেছেন, “দেশ ও জনগণের জন্য কিছু মানুষকে আত্মত্যাগ করতেই হয়, এ শিক্ষাদীক্ষা তো আমার রক্তে প্রবাহিত। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর পর প্রবাসে থাকা অবস্থায় আমার জীবনের অনিশ্চয়তা ভরা সময়গুলোয় আমি তো দেশের কথা ভুলে থাকতে পারিনি?”

​ইতিহাসের চাকা আজ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ৭১-এর পরাজিত শক্তি এবং তাদের দোসর, ৭৫-এর ঘাতক এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা ও পুনর্বাসনকারী এবং বিভিন্ন সময় জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্তদের সমন্বিত মেটিকুলাস ষড়যন্ত্রে দেশ আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। চারদিকে ষড়যন্ত্রের জাল আর অনিশ্চয়তার ধূসর মেঘ। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফিনিক্স পাখির মতো বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠেছেন তিনি। বাংলার ইতিহাসে ‘৭ মে’ যেমন অন্ধকারের বুক চিরে আলোর মশাল হয়ে এসেছিল, বর্তমানের এই কুয়াশাচ্ছন্ন সময়েও তেমনই এক প্রত্যাবর্তনের সুর গুঞ্জরিত হচ্ছে চারদিকে।

​শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নন, মহাজন ইউনুস আর পার্সেন্টেজ ভাইয়া তারেক সরকারের নিপীড়নের যাঁতাকলে অতিষ্ঠ বাংলাদেশের গরিব-দুঃখী অসহায় মানুষ তাঁদের ভালো থাকার ঠিকানা শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন।

​পিতার উত্তরাধিকার যাঁর রক্তে আর জনগণের আশীর্বাদ যাঁর বর্মে- তাঁকে সাময়িক দূরে রাখা যায়, কিন্তু ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব। তাইতো সময় আজ আবারও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনছে সেই পরিচিত সাহসী পদধ্বনি। জনপদ আজ নিস্তব্ধ কিন্তু উন্মুখ; কারণ তারা জানে, রুদ্ধদ্বার ভেঙে আবারও কোনো এক সোনালী ভোরে ফিরে আসবেন তাঁদের আলোকবর্তিকা। অপেক্ষা এখন কেবল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের…

 

এই ওয়েবসাইটের সকল কোনো লেখা, ছবি, অডিও বা ভিডিও “পেজ দ্যা নিউজ” কতৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কপি করা দন্ডনীয়। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করলে কতৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে।