ঢাকাশুক্রবার , ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  1. অন্তবর্তী সরকার
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি ডেস্ক
  4. অস্ত্র
  5. আন্তর্জাতিক
  6. আহত
  7. ইতিহাস
  8. ইলিশ মাছ
  9. উচ্চ বাজার দর
  10. উপহার
  11. এনসিপি
  12. কারামুক্তি
  13. কুমিল্লা
  14. কুমিল্লা প্রতিনিধি
  15. খেলা
আজকের সর্বশেষ খবর

টার্গেট যখন মুক্তিযুদ্ধ : কে, কেন, এবং কীভাবে?

আরাফাত খলিল
সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৫ ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক জনযুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সার্বভৌমত্ব, আজ সেই যুদ্ধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার এক নৃশংস চক্রান্ত চলছে। পাঁচই অগাস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, এমনকি স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতীকী স্থাপনাগুলোকেও টার্গেট করা হচ্ছে। এই আক্রমণের পেছনে রয়েছে একদিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির প্রতিহিংসা, অন্যদিকে রয়েছে একদল স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদের ষড়যন্ত্র, যারা মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগের সাথে মিলিয়ে দিতে চায়, যেন এই যুদ্ধকে একটি দলীয় সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে তার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে ক্ষুন্ন করা যায়।

‘২৪ এর জুলাই দাঙ্গার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল, ভাষ্কর্য, জাদুঘর, এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যক্তিগত জীবনেও হামলা, হেনস্তা, এবং অপমানের ঘটনা ঘটে চলেছে। ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান বিষয়ক এক আলোচনা সভায় মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকীকে দলবদ্ধভাবে হেনস্তা করা হয়, তাকে ‘আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রী’ এবং ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলে ট্যাগ দেওয়া হয়। অথচ তিনি ২০১৫ সালেই দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন এবং জুলাই দাঙার শুরুর দিক থেকেই সরাসরি সমর্থন জানিয়েছিলেন। এই ঘটনা শুধু একটা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের সাথে আওয়ামী লীগকে মিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এই যুদ্ধকে একটি দলীয় বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ ভুল।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণযুদ্ধ, যেখানে বিভিন্ন মতাদর্শ, বিভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তাধারার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই যুদ্ধ শুরু হলেও, এটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির যুদ্ধ। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নিতে পারেনি, যারা একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী ছিল, তারা আজও সেই একই অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধকে আক্রমণ করছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, “যারা মুক্তিযুদ্ধকে আক্রমণ করতে চায়, তাদের জন্য এটা খুব সহজ যে আওয়ামী লীগ বিরোধিতার নামে তারা মুক্তিযুদ্ধকেই খারিজ করে দিতে চায় এবং সেই চেষ্টাই তারা করছে এখন পর্যন্ত।” এই আক্রমণের পেছনে রয়েছে তাদের প্রতিহিংসা, তাদের মতাদর্শিক অবস্থানকে সামনে আনতে চাওয়ার এক রাজনৈতিক কৌশল।

জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এই আক্রমণে স্পষ্ট। যারা একাত্তরে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত, যারা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল, তারা আজও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে চলেছে। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, “দাঙ্গার পরে এন্টিফোর্স যারা থাকে, যেমন জামায়াত—যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করছে, দেখা যায় এই ধরনের উগ্রপন্থিদের উত্থান হয়। তারাই আজ এই কাজগুলো করছে।” জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মতিউর রহমান আকন্দ অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই।

সরকারের ভূমিকা এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নবিদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বলেছেন, “যেখানে যে ধরনের কাজ হয়েছে, সেখানে সে ধরনের সোশ্যাল রিঅ্যাকশন হয়েছে। আমি সেটাকে এভাবেই দেখি।” কিন্তু এই ‘সামাজিক প্রতিক্রিয়া’ থামাতে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেছেন, “সরকারের এই নীরব অবস্থান পালন করার কোনো কারণ নেই। সরকারে যারা আছেন তারা হয়তো ভাবছেন অগাস্ট পরবর্তী সময়ে এই পক্ষটা এত শক্তিশালী, আমরা এদের বাধা দিতে পারব না। অথবা তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন না।” সরকারের এই নীরবতা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে আরও সাহসী করে তুলছে।

মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগের সাথে মিলিয়ে দেওয়া দুর্ভাগ্যজনক। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মুক্তিযোদ্ধা ডা. সারওয়ার আলী বলেছেন, “সশস্ত্র যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, সেখানে সেক্টর কমান্ডারদের কেউ আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন না কিংবা দলটির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেননি। তবে এটিও সত্য যে বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের যে ভাষণ সেটি দ্বারা তারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।” মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি গণযুদ্ধ, এটি কোনো দলের সম্পত্তি নয়। কিন্তু আজ সেই যুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতীকী স্থাপনাগুলোকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কিন্তু যখন সরকার নীরব, যখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি তাদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, তখন এই দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধকে টার্গেট করার মাধ্যমে তারা শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে নয়, বরং সমগ্র বাঙালি জাতির ইতিহাসকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই আক্রমণ শুধু মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে নয়, বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে।

এই ওয়েবসাইটের সকল কোনো লেখা, ছবি, অডিও বা ভিডিও “পেজ দ্যা নিউজ” কতৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কপি করা দন্ডনীয়। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করলে কতৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে।