“সেই সিঁড়িতে পড়ে থাকা লাশ
হাতে ধরা পাইপ, কালো চশমা
সাদা পাঞ্জাবি, চেক লুঙ্গি
বত্রিশের সে বাড়ি আড়াআড়ি।”
(‘ইতিহাসের পাতায় বত্রিশ নম্বর’, নিপুন দাস)
বছর ঘুরে আবারো ১৫ আগস্ট চলে এলো। গত বছর আতংক ও ভয় থাকার পরেও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ও দেশের বাইরে আর্ন্তজাতিকভাবে আমরা জাতীয় শোক দিবস পালন করেছিলাম। ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে অনেকে জঙ্গী মবের হাতে অপদস্থ হয়েছেন; কেউবা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে মিথ্যা মামলার আসামী হয়ে কারাবরণ করেছেন। আমাদের মুজিবপ্রেমী এই সাহসী সন্তানদের জানাই বিপ্লবী সালাম। আজকের এই প্রবন্ধের শুরুতে বাঙ্গালি জাতির পিতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের প্রতি অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
যে প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে ভুল বুঝিয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো হয়েছিলো, গত এক বছরে সেই প্রেক্ষাপটের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট-এর ভোররাতে আক্রমন চালানোর পর থেকে ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহনের আগ মূহূর্ত পর্যন্ত বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা যেত না।
প্রায় ২১ বছর প্রকাশ্যে কোনো সাহিত্য তাকে নিয়ে রচিত হয়নি বা অপ্রকাশ্যে রচিত হলেও সেইসব রচনাবলী জনসমক্ষে প্রচারিত হয়নি। স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মানে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে কিংবা ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে আসার পর দেশনায়ক হিসেবে জাতির পিতা উদ্যোগগুলো নিয়ে কোনো আলোচনা স্থান পায়নি। একইভাবে আড়াল করা হয়েছিলো ১৫ আগস্ট-এর ঘটনাবলীকে। ফলশ্রুতিতে, প্রায় দুইটি প্রজন্ম বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস জানতে পারেনি। গত বছর ৫ আগস্ট-এর পর থেকে আমরা দেখলাম বি.এন.পি (এডভোকেট ফজলুর রহমানের মত দুই-একজন নেতা বাদ দিয়ে), জামায়াত – শিবির – এন.সি.পি-র কর্মীরা তোতা পাখির মত ‘মুজিববাদ’ ও ‘বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদ’-এর বিরুদ্ধে কথা বলছে এবং বঙ্গবন্ধুর মতবাদগুলোকে আমাদের মেধা-মনন থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এ যেন ১৯৭১ সালের ফ্লাশব্যাক। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে হত্যা করার ৪০ বছর পরও বি.এন.পি., জামায়াত-শিবির ও এইসব জঙ্গী, ডানপন্থী দলগুলোর নতুন ভার্সন এন.সি.পি. পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর মত মুজিববাদ ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকেই তাদের মূল শত্রু বলে মনে করছে। তাই আজ মুজিববাদ ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে আলোচনা করব।
মুজিববাদ একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক দর্শন, যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, সংগ্রাম ও রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিতে গঠিত। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক মতবাদ নয়, বরং আমাদের কাছে বাঙালি জাতির মুক্তির পথনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে চিরকাল। মুজিববাদের মূল ভিত্তি চারটি মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—যা ১৯৭২ সালের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, মানবিক ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব। এই দর্শনের শিকড় বঙ্গবন্ধুর শৈশব থেকে শুরু করে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামে প্রোথিত। তিনি বারবার বলেছেন, “বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে, খেয়ে-পেয়ে সুখে থাকবে”—এই মানবিক আকাঙ্ক্ষাই মুজিববাদের প্রাণ।
তরুণ বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, মুজিববাদ মানে শুধু বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক পথপ্রদর্শক, যা বাংলাদেশের উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই ভবিষ্যতের রূপরেখা প্রদান করে। সার্বিকভাবে, মুজিববাদ হলো বাঙালির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম ও মুক্তির প্রতীক। এটি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন।
মুজিববাদের প্রভাব বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, সমাজব্যবস্থা ও রাজনৈতিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও দর্শনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই মতবাদ দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আগেই বলেছি, মুজিববাদের চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—১৯৭২ সালের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। লক্ষ্য করে দেখবেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসররা, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর, এবং এরশাদ ক্ষমতা দখল করবার পর প্রথম আঘাত এই চারনীতির উপরেই করেছে। কারণ, এই চারনীতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাঙালির প্রান ভোমরা – তাদের মুক্তির আকাঙ্খা। সর্বশেষ, মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে বর্তমান ডানপন্থী সরকার ও বি.এন.পি., জামাত-শিবির, এন.সি.পি-সহ ইউনুসের সকল দোসররা বাংলাদেশের সংবিধান থেকে মুজিববাদের এই চার মূলনীতিকে মুছে ফেলার জন্য প্রানান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এই নীতিগুলো ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শেষ হবার পর, নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে এবং একটি মানবিক, শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে । মুজিববাদ দারিদ্র্য দূরীকরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়। বঙ্গবন্ধু শহর-গ্রাম নির্বিশেষে ৯৫% শোষিত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন, যা আজও বাংলাদেশের উন্নয়ন নীতিতে প্রতিফলিত হয় । মুজিববাদ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের চেতনা জাগিয়ে তোলে। এটি রাজনৈতিকভাবে জনগণকে সচেতন করে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে। মতবাদটি একটি ব্যতিক্রমী মডেল হিসেবে বিশ্বে পরিচিত হয়, যেখানে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সঙ্গে গণতন্ত্রের সমন্বয় ঘটানো হয়। এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। সার্বিকভাবে, মুজিববাদ শুধু একটি আদর্শ নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের চালিকাশক্তি। অধ্যাপক আবুল বারকাত তাঁর গবেষণার মাধ্যমে এই কথাগুলো বারবার বলেছেন বলেই আজ তিনি কারাগারে।
মুজিববাদ ও সমাজতন্ত্রের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও গভীর, যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, একটি শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য সমাজতন্ত্র অপরিহার্য। মুজিববাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, যা সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন। বঙ্গবন্ধু প্রচলিত সমাজতন্ত্রের এককেন্দ্রিকতা ও একদলীয় শাসনের বিপরীতে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ থাকবে, কিন্তু অর্থনৈতিক কাঠামো হবে সমাজতান্ত্রিক । মুজিববাদ সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে ধনী-গরিব বৈষম্য দূর করে সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের ওপর জোর দেয়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন, দেশের সম্পদ যেন কেবল কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত না থাকে। মুজিববাদে সমাজতন্ত্র কেবল একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়, বরং এটি ছিল একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের দর্শন, যেখানে ন্যায়, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা সবার জন্য নিশ্চিত করা হবে।
এবার আসা যাক বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা, যা বাঙালি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এটি পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মাধ্যমে বিকশিত হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান স্থপতি। তিনি প্রথমবারের মতো বাঙালিকে একটি জাতি হিসেবে পরিচিতি দেন, যা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে তাদের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। তাঁর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন ও ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়; ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় তিনি বাঙালির স্বাধীনতার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদ চূড়ান্ত রূপ পায়, যার ফলাফল ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। পরবর্তীতে, স্বাধীনতার পর তিনি অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ হিসেবে জাতীয় সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা ও আত্মনিয়ন্ত্রনকে অর্ন্তভূক্ত করেন, যার সুফল বঙ্গবন্ধু কন্যা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার শাসনামলে জাতি হিসেবে আমরা ভোগ করেছি। মনে রাখতে হবে, মুজিববাদের চার স্তম্ভের একটি হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যা বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক দর্শনের ভিত্তি। এটি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিরও প্রতীক।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ড. ইউনুস, তার সরকার এবং দোসর ডানপন্থী ইসলামিক দলগুলো কেন মুজিববাদকে ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদকে তাদের ভাবগত শত্রু মনে করে? কেন তাদের ‘ভাব’ নেতা ফরহাদ মজহার বার বার বলছেন এই মতবাদগুলোকে বাদ দেয়ার জন্য?
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুজিববাদকে মুছে ফেলার চেষ্টা নিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রাজনৈতিক আদর্শের পার্থক্য, ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টা, ক্ষমতা ও প্রভাবের পুনর্বিন্যাস ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকার কারণে ড. ইউনুস, তার সরকার এবং দোসর ডানপন্থী ইসলামিক দলগুলো মুজিববাদ ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদকে মুছে ফেলতে চায়। মুজিববাদ একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ। ডানপন্থী দলগুলো সাধারণত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, বাজারমুখী অর্থনীতি এবং জাতীয়তাবাদের ভিন্ন ব্যাখ্যা পছন্দ করে, যা মুজিববাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ক্ষমতায় এসেই ইউনুস ‘রিসেট বাটনে’ চাপ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস পূন:লিখনের কথা বলেছিলেন। তিনি সেটা করতে চেয়েছিলেন মানুষের চেতনা থেকে বঙ্গবন্ধু, তাঁর আদর্শ ও মতবাদকে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি এবং তার দোসররা ধানমন্ডির ৩২নম্বরের বাড়িসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় স্থাপিত সেইসব স্থাপনা, ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ধ্বংস করে ফেলেন যেগুলো বঙ্গবন্ধু ও তাঁর আদর্শ, মতবাদ ও ইতিহাসকে আমাদের মাঝে তুলে ধরে। ইউনুসের কার্যক্রম দেখে তালেবান বা নাত্সি বাহিনীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতা দখল করবার পর যেভাবে অসাম্প্রদায়িক সকল স্থাপনা ও ভাস্কর্য ধ্বংস করে ফেলেছিলো বা নাত্সি বাহিনী জার্মানীতে যেভাবে তাদের ভাবধারা বিরোধী সকল বই, চিত্রকলা, ইত্যাদি ধ্বংস করে ও পুড়িয়ে ফেলেছিলো, ইউনুস ও তার দোসররাও ঠিক একই মতাদর্শ নিয়ে একের পর এক স্থাপনা ও ভাস্কর্য ধ্বংস করে ফেলছে। লক্ষ্য একটাই বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুর মতবাদ ও আদর্শকে সরিয়ে দেয়া। কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যেমন – বি.এন.পি, জামাত – শিবির, হেফাজত, হিজবুত তাহেরীর, ও এন.সি.পি. ইত্যাদি, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করছে, যাতে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো যায় এবং বিকল্প ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই দলগুলো জানে মুজিববাদকে দুর্বল করে দিলে আওয়ামী লীগের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়, যা ডানপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনে সহায়ক হবে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার একটি “নিরপেক্ষ” অবস্থান দাবি করলেও, ডানপন্থী দলগুলোর সক্রিয় সমর্থন এবং নির্বাচনকালীন সংস্কার দাবির মাধ্যমে আদর্শিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আমাদেরকে ইউনুস এবং তার দোসরদের এই চেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারীর ৫ তারিখ ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর জঙ্গী সন্ত্রাসীরা গুঁড়িয়ে দেয় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ৩২ নম্বরের বাড়ি— যা ছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির বাসভবন—মুজিববাদের প্রতীকী ও ঐতিহাসিক কেন্দ্র। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই বাড়িটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, রাষ্ট্রদর্শন এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান স্মারক। এখান থেকেই বঙ্গবন্ধু ছয় দফা, ও স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। এটি ছিল মুজিববাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক চর্চার কেন্দ্র। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ফলে এটি মুজিববাদের ওপর আঘাতের বাস্তব প্রতীক। জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এই বাড়িটি ছিলো “বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর” হিসেবে সংরক্ষিত, যা এতদিন মুজিববাদের ইতিহাস ও চেতনা বহন করতো।
৩২ নম্বরের বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলার পূর্বে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও ধর্মভিত্তিক অতি ডানপন্থী দলগুলোর কিছু নেতার বক্তব্যে ৩২ নম্বর বাড়ির গুরুত্বকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো। কেউ কেউ বলেছেন, “এই বাড়ি একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতীক”—যা মুজিববাদকে ব্যক্তি পূজার রূপে দেখিয়ে তা মুছে ফেলার একটি আদর্শিক কৌশল হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিলো। বাড়িটি ভাঙার মাধ্যমে ডানপন্থী জঙ্গী-সন্ত্রাসীরা মনে করছে যে, তারা মুজিববাদের ইতিহাস ও চেতনা মুছে ফেলতে পেরেছে। উল্লেখ্য যে, ৩২ নম্বরই শুধু নয়, সারা বাংলাদেশে ১৫০০-র অধিক ভাস্কর্য ও স্মৃতিচিহ্ন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-এর পর ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে – যার বেশীরভাগই ছিলো বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা ও বীরশ্রেষ্ঠ কেন্দ্রীক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জাতীয় প্রতীক। এইসব জাতীয় প্রতীক ধ্বংসের মাধ্যমে অতি ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বর্তমান ইউনুস সরকার জনগণের স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের ওপর আঘাত হেনেছে – যা ক্ষমার অযোগ্য।
মুজিববাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক মতবাদ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মুক্তির চেতনার প্রতীক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই দর্শন আমাদের জাতির জন্য একটি পথনির্দেশনা, যা শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখায়।
আজ, ২০২৫ সালে, আমরা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, ধর্মভিত্তিক দল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মুজিববাদকে মুছে ফেলার এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ৩২ নম্বর বাড়ির ধ্বংস, স্মৃতিচিহ্ন বিলুপ্তি, পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বিকৃতি এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়নের মাধ্যমে তারা জাতির চেতনায় আঘাত হানছে। এই অপচেষ্টা শুধু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং মানবিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে একটি আক্রমণ।
এই বাস্তবতায়, আমাদের করণীয় একটাই—ঐক্যবদ্ধভাবে মুজিববাদকে রক্ষা করা। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সত্য ইতিহাস জানাতে হবে, সাংস্কৃতিক প্রতীক ও স্মৃতিচিহ্নকে সংরক্ষণ করতে হবে, এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে জীবন্ত রাখতে হবে। কারণ, মুজিববাদ শুধু অতীত নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি আলোকবর্তিকা। এটি আমাদের বলে দেয়, কীভাবে একটি জাতি শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন করতে পারে।
আজকের এই সংকটময় সময়ে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে আমাদেরকে নতুন করে জেগে উঠতে হবে। ইতিহাসকে বিকৃত হতে দেওয়া যাবে না, চেতনার ওপর আঘাতকে প্রতিহত করতে হবে। মুজিববাদকে রক্ষা করা মানে, বাংলাদেশের আত্মাকে রক্ষা করা। এই সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি একটি আদর্শিক ও নৈতিক দায়িত্ব—যা আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করতে হবে।

